সমরেশ মজুমদারের “গর্ভধারিণী” আখ্যান

 

গর্ভধারিণী” উপন্যাসটি সমরেশ মজুমদারের অসাধারণ কীর্তি। আধুনিক বাংলা উপন্যাসের উজ্জ্বলতম উদাহরণ এটি। গত শতাব্দীর আশির দশকে লেখা এই উপন্যাসে আছে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের ভুল ব্যবহারের ফলে সৃষ্টি হওয়া সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চিত্র। এবং এই চিত্র পরিবর্তনের জন্য ৩ জন তরুণ আর ১ জন তরুণীর স্বপ্ন, সাধনা ও সংগ্রামের চালচিত্র।

দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া দেশের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য সংগ্রামে একত্রিত হয় ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের চারজন মেধাবী শিক্ষার্থী- আনন্দ, কল্যাণ, সুদীপ, জয়িতা।

কল্যাণ নিন্মবিত্ত পরিবারের ছেলে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ তার কাছে দ্বিধা-দ্বন্দ্বময়। আনন্দের পরিবার নিম্ন-মধ্যবিত্ত। আনন্দ পেয়েছে স্কুল শিক্ষক মায়ের বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ত্ব। আর গোপন রাজনীতি করা বাবার বিপ্লবী চেতনা। অন্যদিকে সুদীপ এবং জয়িতা উচ্চ বিত্ত বাবা মায়ের প্রায় অবহেলিত সন্তান। উচ্চ শ্রেণির আরাম আয়েশ তাদের কাছে কাঁটার মতো। জয়িতার কথা এখানে বিশেষভাবে বলা দরকার। সে মেয়ে। কিন্তু নিজেকে কখনও তথাকথিত মেয়েলি চরিত্রের সাথে একাত্ম হতে দেয়নি। আনন্দ, কল্যাণ, সুদীপ তাকে মেয়ে হিসাবে না ভেবে বন্ধু হিসাবে নিত। কলকাতা প্রেসিডেন্সিতে (বিশ্ববিদ্যালয়) পড়ুয়া এই চার বন্ধু তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের তোয়াক্কা না করে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য ভিন্ন পথে কিছু করতে চাইল। তারা জানত, ওরা যা করতে চলেছে তা আইনত অপরাধ। তবু তারা চেয়েছিল দেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে, ঝাঁকুনি দিতে।

প্রথমে তারা আক্রমণ করে কলকাতার অদূরে ডায়মন্ড হারবারের এক প্রমোদ রিসোর্টে। অসাধু গ্রুপের তৈরি এই প্রমোদ আয়তনে চলছিল পরকীয়া, ব্যভিচারের সাথে মদ জুয়া আর হাই ভলিউমের রগরগে আসর। নিম্নবর্গের মানুষ আর ভারতীয় সংস্কৃতি গাঁথাকে উপহাস করে চলছিল এসব। ওরা বোমা মেরে উড়িয়ে দেয় রিসোর্টটি।
তারপর কলকাতার বড় বাজারে জাল ওসুদ কারখানায় আক্রমণ করে তারা। সবশেষে তাদের গুলিতে নিহত হয় মন্ত্রী ও তার দেহরক্ষী। তাদের এসব হঠকারী কর্মকান্ড খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো কলকাতা। সারা দেশে আলোচনা সমালোচনার ঝড় তোলে। যেখানে দেশের সব মানুষ জেনে না জেনে একই কর্মকান্ডের সাথে জড়িত সেখানে তারা চার বন্ধু কী করে নষ্ট হয়ে যাওয়া সমাজকে পরিবর্তিত রূপ দেবে!?

আইনের চোখে দণ্ডনীয় অপরাধের কারণে পুলিশ হৈন্য হয়ে তাদের পিছু নেয়। এরপর “গর্ভধারিণী” উপন্যাস এক অবিস্মরণীয় বাঁক বদল করে।

নিজেদেরকে বাঁচাতে তারা হিমালয়ের তাপল্যাঙ নামের এক গ্রামে পৌঁছে যায়। তাপল্যাঙ হলো নেপাল বর্ডার এর কাছে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ হাজার মিটার উপরের এই গ্রামে এর আগে কোন বিদেশী স্থান পায়নি। কিন্তু আনন্দরা যাওয়ার পথে এক লোকের দেখা পাই। লোকটি তাপল্যাঙের ধর্মীয় মূর্তি চুরি করেছিল। আনন্দরা মূর্তিটি উদ্ধার করে গ্রামবাসীদের কাছে ফিরিয়ে দিলে তাদেরকে আশ্রয় দেয়।
তাপল্যাঙের অধিকাংশ মানুষ রোগে আক্রান্ত এবং কুসংস্কার আচ্ছন্ন। তারা কখনও ওষুধ গ্রহণ করে না। আনন্দরা তাদেরকে বুঝিয়ে সবার রোগের উপসর্গ কাগজে লিখে কল্যাণকে দার্জিলিঙে পাঠায় ওষুধ নিয়ে আসতে। কল্যাণ ওষুধ ঠিকই স্হানীয় সঙ্গীর মাধ্যমে পৌঁছে দেয়। কিন্তু নিজে আর বেঁচে ফিরতে পারে না। পুলিশের গুলিতে শহীদ হয় সে। কল্যাণের মৃত্যু কলকাতায় আর ফিরতে না পারার পরিস্থিতিতে থাকা অবশিষ্ট তিনজনকে এই গ্রামে শক্ত এক ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
যায় হোক, গ্রামের মানুষ টাকার ব্যবহার জানে না। ফলে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে আসা ব্যাপারীদের কাছে নিজেদের পোষা ছাগল, মুরগী দিয়ে তারচেয়ে অল্প দামের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনে গ্রামবাসী। আনন্দরা দেখল, বেশিরভাগ মানুষই ঠিকমতো খেতেও পারে না। অনাহারে-অর্ধাহারে থাকে। আনন্দ তাদের নিজেদের কাছে থাকা টাকা দিয়ে ব্যাপারিদের কাছ থেকে প্রচুর জিনিস পত্র সংগ্রহ করে। তারপর গ্রামের মানুষকে একত্রিত করতে আরও পরিশ্রম করে তারা।

শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়।

বরফ পড়ার মৌসুমে তাদের জন্য নিরাপদ ঘর তৈরি করে আনন্দরা। ফলে বরফের বছরে যে পরিমাণ মানুষ মারা যেত এবারে সেই হার কমে আসে। গ্রামের মানুষ তাদের বিশ্বাস করে আপন করে নিতে শুরু করে। তারা কলকাতাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিল সেই স্বপ্ন এখানে পূরণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ধনী গরিব, উঁচু নিচু সব মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাঁচবে এমন স্বপ্ন দেখায় তারা। কলকাতার জন্য, পশ্চিমবঙ্গের জন্য এমন কিছু চেয়েছিল ওরা। তাপল্যাঙ এলাকায় উৎপন্ন এলাচ, বেতের ঝুড়ি আর পোষা মুরগির ডিম বিক্রি করে নিকটস্থ সুখিয়াপোখরি বাজারে। বেশ লাভবান হয় তারা। কিনে নিয়ে আসে নিজেদের প্রয়োজনীয় দ্রব্য। আনন্দের সুযোগ্য নেতৃত্ব, সুদীপ-জয়িতার অক্লান্ত সহযোগিতা এবং গ্রামবাসীর সম্মিলিত পরিশ্রমে কাঙ্খিত পরিবর্তন আসতে শুরু করে। দেখাদেখি পাশের গ্রামেও শুরু হয় সমবেতভাবে বাঁচবার চেষ্টা। কিন্তু কুচক্রীদের হাতে নিহত হন পাশের গ্রামের নেতা রোলেন। রোলেনের মৃত্যু দুই গ্রামকে আরও সহযোগিতার বন্ধনে দৃঢ় করে। এদিকে নতুন একটা সমস্যা আবির্ভূত হয় আনন্দ, সুদীপ আর জয়িতার সামনে। গ্রামবাসী চাচ্ছিল, তারা যেন ধর্মীয় নেতা কাহুনের কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করে।সুদীপ, আনন্দ স্পষ্টত প্রত্যাখ্যান করে।
এখানে জয়িতা আবির্ভূত হয় অনন্য মহিমায়। দীক্ষা নিয়ে নিজের নতুন নাম গ্রহণ করে সে। জয়িতা হয়ে যায় দ্রিমিত। দুই গ্রামের সবার সাথে একাত্ম হয়ে যায় সে। হঠাৎ একদিন আবিষ্কৃত হয় জয়িতা গর্ভবতী! শুরু হয় কানা ঘোষা, দুই পুরুষ বন্ধুর মধ্যে টানাপোড়েন, অবিশ্বাস। তাহলে জয়িতা কার সন্তান গর্ভে ধারণ করেছে?
জয়িতাকে কিন্তু সবচে বেশি আপন করে নিয়েছে গ্রামবাসী। কারণ জয়িতা তাদের অক্ষতিকর সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে, ধর্মের সাথে বিরোধে জড়ায়নি। আর ধারণ করেছে তাদের ই একজনের বাচ্চা! কিন্তু কে সে?
কল্যাণ, সুদীপ, আনন্দকে ছাপিয়ে গিয়েছে জয়িতা। সে হয়েছে নতুন এক স্বপ্নের গর্ভধারিণী।

লেখক : শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি, সম্মিলনী মহিলা কলেজ, ঝিকরগাছা।