রাশেদুল ইসলামের “লকডাউনে আমার মা” | নওশীন লিরা

ন্যায়নিষ্ঠ,আদর্শবান,পরোপকারী,স্বচ্ছ হৃদয়ের মানুষগুলো পৃথিবীকে জয় করে স্মরণীয়-বরণীয় হন তাঁদের কাজের মাধ্যমে। স্বার্থপর এবং আত্মকেন্দ্রিক মানুষের স্থান ইতিহাসের পাতা থেকে অনেক দূরে।আমরা তাঁদের কাছেই কৃতজ্ঞ যারা দেশকে ভালোবেসেছেন,দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। কথা,আদর্শ ও কাজের মাধ্যমে তাঁরা সাধারণ থেকে অসাধারণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন এবং মানুষের হৃদয়ে স্থান নিয়ে অমর হয়ে থাকেন ইতিহাসের পাতায়। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ),গৌতম বুদ্ধ,মহাত্মা গান্ধী সক্রেটিস,কাজী নজরুল ইসলাম,মাদার তেরেসা,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,লালন শাহ,সমাজকর্মী ও বইপ্রেমী পলান সরকার ইত্যাদি। তাঁরা দেশের কল্যাণে,মানুষের কল্যাণে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।

এমন কল্যাণমূলক কর্মের উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে অর্পন-দর্পন স্মৃতি ফাউন্ডেশন। অকাল প্রয়াত দুটি পুত্র শিশুর স্মরণে লেখক রাশেদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন অর্পন-দর্পন স্মৃতি ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্য সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের জন্য বিভিন্নমূলক সৎকর্ম করা এবং সৎকর্মে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। লেখক স্পষ্টভাবে বলেছেন সাহিত্যিক হওয়া তাঁর উদ্দেশ্য নয়। মানুষকে সৎ ও কল্যাণমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করাই উদ্দেশ্য। আর এটাকে কেন্দ্র করেই লেখকের সাহিত্য জীবনে প্রবেশ।

এ পর্যন্ত রাশেদুল ইসলামের লেখা সাতটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তারমধ্যে “লকডাউনে আমার মা” বইটি ষষ্ঠ। একুশটি অধ্যায়ের মাধ্যমে আলোচনা করেছেন সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনা। “লকডাউনে আমার মা”বইয়ে লেখক বাল্যকালের যে স্মৃতি বর্ণনা করেছেন তাতে উঠে এসেছে মায়ের প্রতি লেখকের গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ এবং মায়ের কড়া শাসনের মধ্যেও মা যে সততা,জ্ঞান,চেতনা,স্থির মননশীলতার বীজ বপন করে দিয়েছেন সেটা বাল্যকালে না বুঝলেও পরবর্তীতে বুঝেছেন। মায়ের কড়া শাসনের মধ্যে সন্তানের কল্যাণ নিহিত থাকে। আলোচনা করেছেন করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা,সংক্রমণ,মৃত্যুর সংখ্যা,করোনা পরিস্থিতির আগামী দিনগুলি কেমন হতে পারে এবং কিভাবে প্রতিরোধ করা যাবে সে বিষয়গুলি দিনলিপির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
মানুষের প্রতি মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা,সহমর্মিতা মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে অপরিসীম ভূমিকা রাখে।করোনার এই সংকট কালে সবার সংঘবদ্ধতা এবং একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত সকলের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। এছাড়াও ইসলাম,সনাতন হিন্দু,বৌদ্ধ,খ্রিষ্টান সব ধর্মেই সংঘবদ্ধ হয়ে বসবাস করার বিধান রয়েছে।

করোনার সংকট কালে সকল স্তরের মানুষ তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে এসেছেন। এরমধ্যেও কিছু মানুষের সংকীর্ণ মনের পরিচয় পাওয়া গেছে।টেস্টবিভ্রাট অধ্যায়ে লেখক তুলে ধরেছেন ডাক্তারদের অন্যমনস্ক,পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যা ও অবহেলার কারণে একজন রোগীর জীবনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা”লকডাউনে আমার মা”বইয়ে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই বইয়ের সর্বশেষ অধ্যায়ে লেখক শাহীন মিয়া নামক এক ব্যক্তির কথা বলেছেন।শাহীন মিয়া চান না যে তিনি যে সমস্যায় পড়েছেন অন্য কেউ সে সমস্যায় পড়ুক। তিনি সক্রিয়ভাবে সমাজের কল্যাণে,মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন।
অন্যান্য অধ্যায়ে উঠে এসেছে পরোপকারী নানা মানুষের কথা যারা নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে পরিবারের,সমাজের,দেশের মানুষের কল্যাণে অক্লান্তভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

রাশেদুল ইসলামের লেখার মূল প্রতিপাদ্য বলি।মানুষকে সৎ এবং কল্যাণমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করা।তিনি চান মানুষ ধর্মকে সহজভাবে গ্রহণ করুক এবং কোরআন হাদিসের কথা গুলো সহজাত বিচার বুদ্ধির মাধ্যমে ব্যক্তি জীবনে প্রয়োগ করুক। ধর্মের অপব্যাখার কারণে কেউ যেনো বিভ্রান্তিতে না পড়ে।
“লকডাউনে আমার মা” বইটিতে একুশটি অধ্যায়ের মধ্যে দ্বিতীয় অধ্যায়টি হলো মতের মিল-অমিল। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি বলেছেন,মতের মিল-অমিল আছে বলেই পৃথিবীটা এতো বৈচিত্র্যময়! এতো সুন্দর!!
কীভাবে সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করা যাবে? এ প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলেন,নামাজ পড়ে বা সিজদা করে। এভাবে যদি সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করা যেতো তবে তার জন্য ফেরেশতারা যথেষ্ট ছিলো। মানুষকে কেনো সৃষ্টি করা হলো? মানুষ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য কী?এ সম্পর্কে কোরআনে কী বলা হয়েছে?
ধর্মের মূল বিষয় কী? কীভাবে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে যাওয়া যাবে? কীভাবে তাঁকে সন্তুষ্ট করা যাবে?আল্লাহর হক কী এবং বান্দার হক কী? আমাদের কোনটা করা উচিত কোরআন হাদিসের আয়াত নির্দেশ “লকডাউনে আমার মা” বইটিতে স্পষ্ট আলোচনা করা হয়েছে। আছে ইসলাম,সনাতন হিন্দু,বৌদ্ধ,খ্রিষ্টান সব ধর্ম নিয়ে বইটিতে বিস্তারিত আলোচনা।
জর্জ বানার্ডশ বলেছেন,”ধর্ম একটাই,যদিও রয়েছে এর বহুরূপ।”
আমরা একটু গভীর করে ভাবলেই দেখতে পাবো যে,
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,এই কিতাব আমি তোমার(মহানবী)এর ওপর নাজিল করেছি যাতে তুমি সমগ্র মানবজাতিকে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে পার।
(সুরা ইবরাহিম-আয়াত১)
হিন্দুধর্মের সারকথা অনুযায়ী স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন,
“জীবে প্রেম করে যেই জন
সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।”
বৌদ্ধধর্মে বলা হয়েছে,”জীবহত্যা মহাপাপ”।
সবাইকে নিয়ে শান্তিতে থাকাই খ্রিষ্টধর্মের মূল শিক্ষা।
অতএব,সবধর্মের মূল কথা শান্তি।
টমাস পেইন-এর একটি উক্তি,
“”সব ধর্মই ভালো কারণ সব ধর্মই
কল্যাণের কথা বলে।””

“লকডাউনে আমার মা”বইটি আমার জন্য। আপনার জন্য। আমাদের এবং আপনাদের জন্য।আমি,তুমি,সে,তারা,যখন “সবাই” হয়ে উঠবো তখন পরিবারের শিকল,সমাজের শিকল,দেশের শিকল এমনকি সারা বিশ্বের শিকল শিথীল হবে। অর্থাৎ লকডাউন কেটে যাবে- মানসিক, পারিবেশিক।।