বইপড়া প্রতিযোগিতা কেন? : রাশেদুল ইসলাম

২০১৬ সাল থেকে আমি লেখালেখি করি । অতীত ইতিহাস বা সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে লিখি । লেখায় কোন সমস্যার দিক আলোচনার পাশাপাশি, নৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক বিচারে আমাদের করণীয় বিষয়ও উল্লেখ করার চেষ্টা থাকে । এসব লেখা নিয়েই আমার ৭ টি বই এখন বাজারে পাওয়া যায় । লেখালেখি করি ঠিক আছে; কিন্তু আমাকে যে কখনো বইপড়া প্রতিযোগিতায় নামতে হবে, তা গত এক বছর আগেও আমার মাথায় আসেনি । বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘটিত তাণ্ডবলীলা আমার এক ধরণের দিব্যদৃষ্টি খুলে দিয়েছে । ভবিষ্যতে এ রকম আর কয়েকটি ঘটনা ঘটলে দেশের যত অর্জন, দেশের সাধারণ জনগণের যত স্বপ্ন- তা ম্রিয়মাণ হতে মোটেও সময় লাগবে না । কিন্তু সমস্যার গভীরতা এত বেশী যে, জোর করে, বা বল প্রয়োগ করে সাময়িক সমাধান মিললেও পরিপূর্ণ জনসচেতনতা সৃষ্টি করা ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় । আমার ‘এগিয়ে যাওয়ার জন্য বই পড়ি’ প্রতিযোগিতা মূলত সেই জনসচেতনতা সৃষ্টির একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র । অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউনডেশণ আয়োজিত এ কর্মসূচীর সুফল রাতারাতি পাওয়া যাবে না সত্য; কিন্তু আমার জীবদ্দশায় যদি সারাদেশ ব্যাপী এই প্রতিযোগিতা চালানো যায়, তাহলে একটা কার্যকরী ফলাফল আসবে বলে আমার বিশ্বাস । ‘আমার জীবদ্দশা’ মানে অনির্দিষ্ট কোন সময়কাল নয় । বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষের গড় আয়ু ৭০ বছর । সেই হিসেবে আমার হাতে এখনও ১০ বছর সময় আছে । সেই সময়কে ‘আমার জীবদ্দশা’ বলা হয়েছে ।
আমাদের দেশে বইপড়া আন্দোলন নতুন কিছু নয় । পলান সরকারের মত অনেক মহান ব্যক্তিত্ব স্থানীয় পর্যায়ে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করে জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন । আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন । তাঁর নিরলস পরিশ্রমের ফসল দেশব্যাপী চলমান ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরী কর্মসূচী । বলা যায় শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ দেশব্যাপী বইপড়ার যে প্লাটফরম গড়ে তুলেছেন, তার প্রত্যক্ষ অনেক সুফল ‘এগিয়ে যাওয়ার জন্য বই পড়ি’ প্রতিযোগিতা পেতে পারে । তবে, ‘এগিয়ে যাওয়ার জন্য বই পড়ি’ প্রতিযোগিতার প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ আলাদা ।
আমরা কানকথা শুনি । অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হই । সমাজে বা চাকুরীতে উচ্চ আসনে থাকা অনেক মানুষের সাথে আমি মিশেছি । তাঁদেরকেও কানকথা শুনতে এবং অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হতে দেখেছি আমি । এই কানকথা শোনা বা অন্যের কথায় প্রভাবিত হওয়া ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের জন্য ক্ষতিকর । কানকথা শোনা নৈতিক ও ধর্মীয় দিক থেকেও রীতিমত অন্যায় । কিন্তু আমরা এই কাজগুলো করি । ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রাগৈতিহাসিক কায়দায় যে ধ্বংসলীলা চালানো হয়, তার পিছনে কানকথা এবং অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ঘটনা ছিল মুখ্য । যে বা যারা এই ধ্বংসলীলা চালিয়েছেন তাদের নিজেদের ধর্ম সম্বন্ধে প্রকৃত জ্ঞান থাকলে, এমনকি তাঁরা যদি নিজেদের সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করার জ্ঞান রাখতেন, তাহলেও এ ধরণের ঘটনা ঘটত না । অবাক ব্যাপার নিজের ধর্ম সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা না থাকার কারণে সমাজের একটি বড় অংশ তাঁদের কর্মকাণ্ড সমর্থন করেছেন । বলা যায় এই জট খুলতেই ‘এগিয়ে যাওয়ার জন্য বই পড়ি’ প্রতিযোগিতার আয়োজন ।
অনেকে প্রশ্ন করেন-
যদি বইপড়া প্রতিযোগিতা হয়, তাহলে নজরুল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নয় কেন ? কোন বরেণ্য লেখকের বই নয় কেন ?
বরেণ্য লেখকগণের প্রতি আমার অপার শ্রদ্ধা । আমি যদি একসাথে মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিবীণা’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ বইগুলো পড়ার প্রতিযোগিতার আয়োজন করতাম, তাহলে শুনতে ভালো লাগতো । কিন্তু সেখান থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটে যাওয়া সমস্যা বা চলমান অন্য কোন সমস্যার সমাধান নিয়ে চিন্তা করা প্রতিযোগীদের জন্য কঠিন হত । বরেণ্য লেখকগণ বই লেখেন আমাদের জন্য । আমি তাঁদের বই পড়ি । সেই জ্ঞান দিয়েই আমি বই লিখি সাধারণ মানুষের জন্য । আমার একটা বই পড়ে একজন সাধারণ পাঠক যা জানবেন; তা জানার জন্য তাঁকে কমপক্ষে ২০ টি বরেণ্য লেখকের বই পড়তে হাবে – যা স্বল্প সময়ে তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় । বরং আমার সাধারণ মানুষের জন্য লেখা বই একজন পাঠককে অন্য লেখকের বই পড়তে আগ্রহী করতে পারে । অন্তত ঝিকরগাছার পাঠকদের মধ্যে জরীপ চালিয়ে সে রকম তথ্যই পাওয়া গেছে ।
‘এগিয়ে যাওয়ার জন্য বই পড়ি’ প্রতিযোগিতার সাথে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় সুধী সমাজকে সম্পৃক্ত করা হয় । এই প্রতিযোগিতা ঝিকরগাছা উপজেলায় বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট সকলের যে আন্তরিকতা ও সহযোগিতা পাওয়া গেছে, সকল উপজেলায় এ ধরণের সাহায্য পাওয়া গেলে এ কর্মসূচীর সফলতা অনিবার্য।