[গল্প] আকাশ আমার মতো কাঁদে | সানজিদা আক্তার শ্রেয়সী

একদিন এক রৌদ্রজ্বল বিকেলে রেল স্টেশনে আমাদের হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে। যেখানে প্রথম তোমার শাড়ির আঁচল আমার শার্টের বোতাম ছুঁয়ে গিয়েছিলো… একদিন কাকতালীয়ভাবে স্টেশনে তোমার নজরে পড়ে যাবো।
আমি যাত্রী ছাউনিতে বসে পত্রিকা পড়ছিলাম, চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে আচমকা চোখ গেলো তোমার দিকে— বছর কয়েক পর পথের বাঁকে এভাবে তোমার চোখে চোখ পড়তেই চিনচিনে ব্যথা দোলা দিয়ে গেলো। হয়তো তুমি ভাববে আমি দেখছি না তোমাকে। ঠিক তেমনটা আমিও ভাববো তুমি দেখছো না আমাকে। কিন্তু দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকবো নিষ্পলক। তোমার চোখের উজ্জ্বল প্রভা আঁচড়ে পড়বে আমার চোখে।
আমি বসেই রইলাম। এতটা কাল পরে টুকরো টুকরো সব ব্যাবধান ঘুচিয়ে পাশে এসে বসলে। পুরো পৃথিবী নিস্তব্ধ হয়ে যাবে কিছুক্ষণ। তাকিয়ে থাকবো নিষ্পলক, কোনো কথা নেই মুখে।
ভেসে আসবে তোমার গলার শুষ্ক স্বর—
“দেখেও একবার কথা বলতে এলে না যে?”
আমি শান্ত গলায় উত্তর দেবো—
“ভাবলাম, কেউ হয়তো বোধহয় আছে সাথে। তাই আর কি!”
“এভাবে তাকিয়ে আছো যে?”
” সেই কাজল লেপ্টানো চোখ! শ্রেয়সীর চোখের মায়া কাটানো এতটা সহজ নয়। সে ক্ষমতা আমার নেই। আচ্ছা বাদ দাও। তোমার কথা বলো। সংসার কাটছে কেমন?”
“ভালো।”
” তোমার উনি আসেন?”
“নাহ, ও অফিসের কাজে আছে, আগামীকাল আসবে কাজ সেরে।”
তোমার মেয়েটার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলবো— “প্রিশা দেখতে খুব সুন্দর হয়েছে। আমার কাছে একটু দাও, আদর করে দিই।”
আচমকা বলবে, “তুমি ওর নাম জানলে কি করে?”
“আমি তো কোনো কিছুই ভুলিনি শ্রেয়সী। শুধু ভালো থাকতে ভুলে গেছি, বাঁচার মতো বেঁচে থাকতে ভুলে গেছি।”
“তুমি বিয়ে করলে তোমার এমন একটা মেয়ে থাকতো।”
“আমার তো মেয়ে আছে।”
“মানে?”
“মানে হলো আমি একটা আশ্রয় স্থল করেছি অসহায় বাচ্চাদের জন্য। নাম ” প্রিশা আশ্রয়কেন্দ্র”… এটাই আমার মেয়ে! “
” এ কি অবস্থা তোমার? এতো অগোছালো কিভাবে থাকে মানুষ?”
“আমার তো গোছানোর কিছু নেই। আমি একজন নিরানন্দ নিথর মানুষ।”
“তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছিলে তাইনা?”
“কষ্ট কি জিনিস আমি একসময় ভুলেই গিয়েছিলাম। পৃথিবীতে একদল মানুষের জন্ম হয়েছে কেবল কষ্ট পাবার জন্য, আমি সেই দলে পড়ে গেছি, তার নিয়তি বলে মেনে নিয়েছি। জীবন্ত লাশ লাশ লাগে নিজেকে, খারাপ না!”
“রাত জাগা অভ্যেস আছে এখনো, আমার কথা মনে হয়?”
“আমি জাগি না, রাত আমাকে জাগিয়ে রাখে। শুধু তোমার মুখের ছায়া কেঁপে উঠলে বুক জুড়ে রাতটা জেগেই কাটাই, বেশ লাগে, সম্ভবত বুকের ভেতরে দুশো ছ’টা বজ্রপাতের মতো তীব্র আওয়াজ হয়। বুকের উপর এও হাজার টন পাথর চাপানো মনে হয়, বেশ লাগে!”
“তুমি এখনো একা থাকো আমি জানি।”
“ঠিকভাবে গল্পটা শুরু হলে আজ হয়তো আমাকে একা থাকতে হতো না, কিংবা তোমাকে খুঁজতে হতো না মানষুের ভীড়ে।”
“একা থাকতে একা লাগে না? আর কতদিন?”
“কে বললো আমি একা? আমি একা নই, তোমার কিছু ছবির ফ্রেম আর কিছু সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত আছে আমার কাছে। এরা প্রতিদিনই আমার সাথে আমার বিছানায় একসাথে ঘুমায়। আমার সাথে কবিতা লেখে, খায় দায়, ঘরের ভেতরে হাঁটাচলা করে। আমি ডাকলে তারা সাড়া দেয়। তারা হাসে কাঁদে কথা বলে।”
“আচ্ছা, যে প্রশ্নটার উত্তর থেমে আছে এতকাল তার উত্তর দাও— আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে? কিছুই কি নেই নাকি”
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি— “রাতের সব তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে।”
কিছুক্ষণ দীর্ঘশ্বাস চেপে আবার বলে উঠলাম— “আচ্ছা আমার না খুব জানতে ইচ্ছে করে, আজ এতদিন পরেও কি তোমার মনের ভেতরে আমার জন্য একটুও ভালবাসা অবশিষ্ট নেই? তুমি কি আমাকে এক মুহুর্তের জন্যেও কি কখনো ভালবাসতে পারোনি?”
তোমার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হবে না। শুধু নির্নিমেষ চাহনি লণ্ডভণ্ড করে দেবে ভেতরটা।
আমি বলে উঠবো— “থাক, মুখ দিয়ে বলা লাগবে না। এই যে তোমার কিছু স্মৃতি আছে, বিশ্বাস করো এটা নিয়ে আমি সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবো। আমার আর কিছু লাগবে না। আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি, হয়তো এই যে দেখা হবে এটার জন্যই এতটা কাল রয়ে গিয়েছিলাম।”
আচমকা আমাদের ট্রেন চলে আসবে। আর কোনো কথা থাকবে না কারো মুখে। শুধু বলবো, চলো সামনে এগোই। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। কিছু না বলে তোমার পিছু পিছু হাঁটবো। আনমনে সর্তক দৃষ্টিতে নিরাপদ দূরত্বে দাড়িয়ে তাকাই গোধূলি রাঙা আকাশের দিকে। অদ্ভূত সুন্দর লাগছে। তবু মনে হচ্ছে আকাশটা গুমরে কাঁদছে ঠিক যেন মনের মত।
লেখক : শিক্ষার্থী, একাদশ, মানবিক, ঝিকরগাছা মহিলা কলেজ।
ছবি : সানজিদা আক্তার শ্রেয়সী
ছবি : সানজিদা আক্তার শ্রেয়সী