সম্যক আলোচনা : লকডাউনে আমার মা | ইশতিয়াক ইমন

পাঠ প্রতিক্রিয়া

সম্যক আলোচনা
বই: লকডাউনে আমার মা
লেখক: রাশেদুল ইসলাম
শুরুতে কিছু কথা-
একাধারে কথাসাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ড. আফরোজা পারভীন এর পর্যালোচনা বইটিকে অনন্য মাত্রা যোগ করেছে বলে আমার মনে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার কম বই পড়া হয়। কিন্তু তাঁর, ‘লকডাউনে আমার মা’ বই সম্পর্কে পর্যালোচনা আমাকে বইটি পড়তে যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করেছে এবং সাথে সথে সাহিত্যিক শব্দচয়নে আমাকে যথেষ্ট সতর্ক হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাঁর পর্যালোচনা ছিল এক কথায় অসাধারণ। অসংখ্য ইতিবাচক বিশেষণ। তাঁর পর্যালোচনার পর, আর এই বই সম্পর্কে লেখার আর কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। শুধুমাত্র আমি বইটি পড়ে যা বুঝেছি বা যে শিক্ষা পেয়েছি তা-ই লেখার চেষ্টা করছি।
[।।বাস্তবতা।। বইটি পড়লে মনে হয়, লেখক একজন সাধারণ মানুষের জীবন ও তার মনের সকল প্রশ্ন আর চিন্তাধারাকে বুদ্ধিদীপ্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল প্রতি অধ্যায় শেষে অ্যায়টি লেখার স্থান ও তারিখ এর উল্লেখ আছে। এই উল্লেখ একজন পাঠককে উক্ত সময় ও স্থানের সাথে বর্তমান সময় ও তার স্থানের তুলনা করতে সক্ষম হবে। এই ব্যাপারটি বইটিকে সমসাময়িকতার ভাব আনতে ও পাঠককে বইটির শেষ পাতা পর্যন্ত নিয়ে যেতে একটি বড় ভূমিকা পালন করবে, বলে আমার মনে হয়েছে।]
মূল আলোচনা-
‘লকডাউনে আমার মা’ বইটির প্রথম অংশে লেখোকের মা সম্পর্কে লিখিত বিবরণ যে কোন ব্যক্তিকে নিঃসন্দেহে
নিজের ছেলেবেলার  আবেগঘন স্মৃতি ও অনুভূতিকে মনে করিয়ে দেবে। তাঁর প্রতি তার মায়ের শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারটি প্রস্ফুটিত করবে। এর পরবর্তী অংশে ধর্ম বিষয়ে তাঁর সাথে তাঁর বন্ধু ও পাঠকদের মতের মিল ও অমিলকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে কুরআনের আলোকে যুক্তিখণ্ডন করেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর যুক্তি ও ব্যাখ্যা অনেক উন্নত মনে হয়েছে।
এই করোনাকালীন সময়ে জীবনের অর্থে সকল স্তরের মানুষ কিভাবে সকলের সাহায্যে এগিয়ে আসছে এবং একইসাথে কিভাবে কিছু নিচু ও সংকীর্ণ মনের মানুষ আত্মসাৎ এর পথ বেছে নিয়েছে তা তিনি একটি দলিল হিসেবে প্রকাশ করেছেন- বাস্তব জীবন ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে। করোনাকালে করোনাভাইরাস এর প্রকোপ তিনি ব্যাখ্যা করেছেন এবং মুজিববর্ষের একুশে মার্চ করোনাভাইরাস সম্পর্কে দেশের জনগনকে সজাগ ও সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিঁনি। লেখক করোনাভাইরাসের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত, ভবিষ্যতে এর প্রাদূর্ভাব কেমন হতে পারে এবং একইসাথে করোনাযোদ্ধাদের স্মরণীয় রাখা বা না রাখার ব্যাপারটি সুচারুভাবে তুলে ধরেছেন বইটির বিভিন্ন অংশে। একইসাথে তিঁনি করোনাভাইরাস প্রতিরোধকল্পে আমাদের এদেশের জন্যা কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি অবলম্বনে, এবং দেশবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। এক্ষেত্রে সহজাত বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করাকে তিঁনি জোর দিয়েছেন।
তিঁনি উল্লেখ করেছেন সেসব সংকীর্ণ মানসিকতার ক্ষমতাবানদের, যারা ক্ষমতার প্রয়োগ করে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করে। মূলত ক্ষমতা থাকলে তার অপব্যবহারে আমরা বাঙালিরা পটু সেটিই বুঝিয়েছেন তিনি, উদাহরণের মাধ্যমে। লেখক অতি ক্ষুদ্র কিন্তু বিচক্ষণ উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন ধর্মকে, সেক্ষেত্রে কুরআনের ব্যাখ্যাসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তিঁনি অকপটভাবে প্রকাশ করেছেন যে, তাঁর লেখার উদ্দেশ্য বড় সাহিত্যিক হওয়া নয়। বরং মানুষকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করা যার পরিপ্রেক্ষি তাঁর অকালপ্রয়াত দুই সন্তান অর্পন ও দর্পন। যাদেরকে স্মৃতিতে রেখে তিঁনি গড়ে তোলেন ‘অর্পন-দর্পন স্মৃতি ফাউন্ডেশন ‘। আর এই ভালো কাজে উদ্বুদ্ধকরণের বোধ থেকেই তাঁর ধর্মবিষয়ক লেখার সূচনা হয়। তাঁর বিশ্বাস ধর্মের অপব্যাখ্যার কারণে সমাজে যে অপরাধ সংঘটিত হয় তা দূর করতে ধর্মবিষয়ক স্চছ ধারণা একান্ত প্রয়োজন। তাছাড়া, করোনাকালের সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লেখক কিছু কবিতা ও সাথসাথে এগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন।
মানুষ চায় তার পূর্বধারণায় অটুট থাকতে, সে পরিবর্তন বা পরিবর্ধনে যথেষ্ট অপটু। এক্ষেত্রে কয়েকটি বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে লেখক বুঝিয়েছেন যে, এই অভ্যাসটি মানুষ তার শিক্ষাদীক্ষা ও সহজাত বিচার, বুদ্ধি, বিবেক দিয়ে পরিবর্তন করতে পারে। করা উচিত। একইসাথে তিঁনি সকলকে আহ্বান করেছেন করোনাযোদ্ধাদের মত মানবিক হতে। কেননা, প্রতিটি ব্যাপার এরই একটি ভালো ও এাকটি খারাপ দিক থাকে। তাছাড়া, করোনা মহামারীতে কেউ যেন তার কথা বা কাজের মাধ্যমে নিজের আখের না গোছায় বরং পরোপকারে কাজে লাগায়; একইসাথে সাধারণ মানুষ যেন ধোকায় না পড়ে নিজের বুদ্ধি আর বিবেক কাজে লাগায়, সেটাই লেখকের আহ্বান।
বইটির একেবারে শেষে দেশের বর্তমান চিত্র চমৎকারভাবে তুলে ধরে বোঝাতে চেয়েছেন, শত মহামারীতেও কৃষকেরা তাঁদের কাজ করে যাচ্ছেন, দেশকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, এই অতিক্ষুদ্র করোনাভাইরাস তাঁদেরকে থামিয়ে রাখতে পারেনি সৎকর্ম করতে। সবশেষে একজন ব্যাক্তির কথা বলেন, যে নিজে যেই সমস্যায় পড়েছেন তিঁনি চেয়েছেন অন্য কেউ যেন সেই সমস্যায় না পড়ে। পাঠককে সৎকাজে, পরোপকারে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সেই ব্যাক্তির কাজের কিছু অংশ লেখক তুলে ধরেছেন। লেখক তাঁর নিজের ভাবাদর্শের সাথে সেই ব্যাক্তির যথেষ্ট মিল পেয়েছেন বলে আমার মনে হয়েছে।
তাঁর বই পড়ে আমার মনে হয়েছে, তাঁর লেখা অনেক বেশি জীবন্ত, প্রাণবন্ত, বাস্তববাদী, উদ্দীপক আর অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকারী। তাছাড়া, লেখার মধ্যে লেখকের বিনয়ী ভাব চোখে পড়ার মত। লেখক বিভিন্ন সময়ে তাঁর বাস্তব ও ব্যক্তিগত জীবনের সাথে বিভিন্ন বিষয়াদি তূলনা করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। পাঠকের জীবনের সাথে মিল-অমিলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। তাছাড়া, বইটির ভাষা খুবই সহজ, সাবলীল এবং মর্মার্থে ভরপুর। যেকোনো স্তরের পাঠক সাবলীলভাবেই বইটি পড়তে ও এর অর্থ বুঝতে সক্ষম হবেন এবং লেখকের উদ্দেশ্য বোধয় এটিই ছিল।
শেষে এটা বলা যায়, “This book is a perfect guideline of COVID’19 coronavirus for all spheres of the people during this pandemic irrespective of race, religion and caste and the description is based on spectacular and remarkable elaboration of the author (according to his vast spheres of knowledge, thinking as well as religious views).”