বাবুর চরের বাতিঘর:অমর একুশে গণগ্রন্থাগার

বাবুর চরের বাতিঘর:অমর একুশে গণগ্রন্থাগার

সামিউল হুদা


রাত জেগে আপনি ভাবছেন বই পড়ার কী কী উপকারিতা? হৃদয়ের গভীর থেকে অনুভব করলেন বই পড়লে মাথার ভিতরে কল্পনার জগৎ তৈরি হয়। মনের সেই ভুবনে ঘুরে বেড়ানো পাঠক দেখতে পায়, বইতে লেখা কথাগুলি তারই। এই আত্মিক বন্ধন কালের নিয়ম মানে না। পাঠক কখনও অতীতে বেঁচে থাকা জ্ঞানী-গুনী মানুষের বৈঠকখানায় আমন্ত্রিত অতিথি, কখনও তাদের সাথে কোন খোসগল্পে মশগুল। অথবা গল্প উপন্যাসে বলা সমাজের সমস্যা বর্তমান সময়েও যা প্রাসঙ্গিক, কী সমাধান আছে বইতে, মিলিয়ে দেখতে পারে পাঠক।
ছবি : এএমপিএমবিডি
একটা এলাকায় সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণগ্রন্থাগার থাকার প্রয়োজনীয়তা স্কুল-কলেজ থাকার মতই। কোন কোন ক্ষেত্রে স্কুলের নিরানন্দ একাডেমিক পড়াশোনার ঘাড়তি পূরনে গ্রন্থাগার গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আপনার প্রিয় গ্রামের মত আমাদের বাবুরচর গ্রামটিও সুন্দর। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের একটি গ্রাম এটি। এই গ্রামের একটা গর্বের বিষয় হলো, এখানে শিক্ষার হার ভাল। এখান থেকে প্রতিবছরই শিক্ষার্থীরা দেশের নামকরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। এমন কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থীর উদ্যোগে সদরপুর উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় ২০১১ সালে বাবুরচরে প্রতিষ্ঠিত হয় “অমর একুশে” গণগ্রন্থাগার। সংগঠকদের একজন সেলিম আহমেদ ৩৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেন। অন্যতম সংগঠক নাইমুর রহমান সহকারী পোস্ট মাস্টার জেনারেল হিসেবে সরকারি চাকুরীতে যোগ দেন ৩৭তম বিসিএসে। অমর একুশে গণগ্রন্থাগারের প্রথম সাধারণ সম্পাদক এস এম শরিয়তুল্লাহ্ বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে এ্যাসিসট্যান্ট জাজ হিসেবে কর্মরত। আরেকজন সংগঠক শেখ সাকিব বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালের (কুয়েট) সহকারী অধ্যাপক। সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ইংরেজি বিভাগের জনপ্রিয় শিক্ষক জনাব কামাল উদ্দিন এবং আদমজি ক্যান্টমেন্ট কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক তানভীর রহমান অমর একুশে গণগ্রন্থাগারের কার্যনির্বাহী কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী মহসিন আহমেদ যিনি বর্তমানে জনতা ব্যাংকের কর্মকতা, প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি গ্রন্থাগারের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেন। সহ-সভাপতি হিসেবে আরও দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে কন্ট্রোলার এ্যান্ড অডিটর জেনারেল, বাংলাদেশ অফিসের এসএএস সুপারিন্টেনডেন্ট জনাব সজল মিয়া। সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ,ফরিদপুরের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রভাষক জনাব কামরুল হাসান প্রথম কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। গ্রন্থাগারের সাবেক সভাপতি এ্যাডভোকেট জুয়েল আইন পেশায় সফলতা অর্জন করেছেন। অমর একুশে গণগ্রন্থাগারের অন্যতম সংগঠক এবং প্রথম প্রচার সম্পাদক মো. রুবেল খানের অকাল মৃত্যু আমাদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।
গ্রন্থাগারের বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি মেধাবী শিক্ষার্থী রাসেল মাহমুদ ও সংগঠনের পরীক্ষিত সদস্য লিটন মাহমুদের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় গ্রন্থাগারের কার্যক্রম সুচারুরূপে সম্পন্ন হচ্ছে।
ছবি : এএমপিএমবিডি
মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উৎসমুখ ভাষা আন্দোলন বাঙ্গালি জাতির হৃদয় স্পন্দন। ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্যের কথা বিবেচনা করে এলাকাবাসী গ্রন্থাগারটির নামকরণ করে দিয়েছিলেন “অমর একুশে গণগ্রন্থাগার”।
স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অমর একুশে গণগ্রন্থাগার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে গ্রামের মানুষের সহযোগিতায়। এলাকার পেশাজীবী, ব্যবসায়ী এবং বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী ভাইদের সহযোগিতায় গ্রন্থাগারটি ভালভাবেই চলছে। লাইব্রেরিয়ানের বেতন এবং পত্রিকা বিল এলাকাবাসীই বহন করেন। আমাদের মহান বিজয় দিবস,স্বাধীনতা দিবস এবং জাতীয় শোক দিবস ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালন করে অমর একুশে গণগ্রন্থাগার। বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ বিতরণ,ঈদের সময় অসহায় মানুষের পাশে দাড়ানো, মাদক বিরোধী সচেতনতা তৈরি, বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা, বাল্যবিবাহ বিরোধী প্রচারণাসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজ ২০১১ সাল থেকে নীরবেই করে যাচ্ছে অমর একুশে গণগ্রন্থাগারের সাথে সংশ্লিষ্টরা।
ছবি : এএমপিএমবিডি
অমর একুশে গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার সময় এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন।সহায়তা করেছেন তৎকালীন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মরহুম দুদু মিয়া বেপারী, প্রাক্তন উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব ফকির আব্দুস ছাত্তার, প্রাক্তন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জনাব হারিজুর রহমান, জনাব মো. মোকসেদ খান, জনাব বাচ্চু চোকদার, জনাব মিজানুর রহমান পিংকু, জনাব মো. বোরহান খান, জনাব প্রদীপ কুমার বণিকসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। আর্থিক সাহায্য করে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জনাব মো. শওকত খান,জনাব এফ এ লিটন, বিশিষ্ট সমাজসেবক ডা.মো হুমায়ুন মিয়া, জনাব মো.পলাশ মাহমুদ, জনাব মো. ওবায়দুর খান, জনাব সজীব মাহমুদ,জনাব মো. নজরুল ইসলাম, জনাব মো.স্বপন খানসহ এলাকার আরও অনেক গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। বাবুরচর জামে মসজিদের ঈমাম সর্বজন শ্রদ্ধেয় আব্দুল লতিফ মিয়া তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা অনেক বই দিয়ে গ্রন্থাগারকে সহায়তা করেছেন।
ছবি : এএমপিএমবিডি
তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই সামাজিক প্রতিষ্ঠানটি বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব এলাকাবাসী সকলের। তাতে আপনার এবং অত্র অঞ্চলের অন্যান্য সকলের কোমলমতি সন্তানরা উপকৃত হবে।
“আর আঁধার নয়, এবার আলো”- এই শ্লোগান নিয়ে কাজ করা অরাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যদের আবেগকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে বাবুরচর গ্রামকে একটি আদর্শ গ্রামে পরিনত করার দায়িত্ব সকলের।
লেখক : প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান
সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর।
বিজ্ঞাপন