লবনের লাইনে হুজুকে বাঙ্গালি ll এম আর মাসুদ

বাঁশের পানি খেয়েছি, আড়াইশ টাকায় পেঁয়াজ কিনেছি, লবন নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছি

আমরা বাঙ্গালি। জাতি হিসেবে আমাদের আছে বহু অর্জন। মাতৃভাষা থেকে শুরু করে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত প্রতি পদে পদে আমাদেরকে প্রাণ দিতে হয়েছে। বইছে রক্ত নদী। যা ধরণীর আর কোন জাতিকে এত সবের পরীক্ষায় খাতা ভরাট করতে হয়নি। অবশ্য বিশ্ব মাতব্বরেরা তার স্বীকৃতিও দিয়েছে আমাদেরকে। তবে বিশ্ব মাতব্বরেরা আমাদেরকে বীর বলুক আর বাহাদুর বলুক আমরা কিন্তু আমাদেরকে ‘হুজুকে বাঙ্গালি’ বলি। সেই হুজুকে আমরা কখনো কথনো বেহুস হচ্ছি, আবার কখনো কখনো হুসের খেসারত দিচ্ছি। তাই হয়ত গভীর রাতে বাঁশের পানি খেয়ে রোগ বিয়োগ হওয়ার পরিবর্তে ঠান্ডা সারার জন্য সকালে ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। আড়াইশ টাকায় পেঁয়াজ কিনেছি, লবন নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছি।
ঘটনাটি কয়েক বছর আগের। মধ্যরাতে হঠাৎ ছোট বোনটির নাম্বার থেকে মোবাইলে কল আসল। ফোনটি রিসিভ করার সাথে সাথে বোনটি বলল, ভাই তাড়াতাড়ি একটা জগ নিয়ে আমাদের বাঁশ বাগানে চলে আই। বাঁশ গাছ থেকে পানি বের হচ্ছে। এই পানি যে কোন একটি রোগের নাম করে খেলে তা ভালো হয়ে যাবে। তুই তাড়াতাড়ি আই…। এসব বলতে বলতে ও ফোনটা কেটে দিলো। কিছুক্ষণ পর আমি ফোন করে ওকে বললাম, বাঁশ গাছের পানি আমি খাব না। ওদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির পথ পাঁচ মিনিটের। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ও এক জগ বাঁশ গাছের পানি নিয়ে হাজির। বলছে, আল্লাহ নাম করে খা। তোর গ্যাসের সমস্যা আর থাকবে না। শেষ পর্যন্ত মাও বোনটার সাথে তালমিলিয়ে বলল, বাঁশ গাছ থেকে যখন পানি বের হচ্ছে তখন নিশ্চয় আল্লাহর নেয়ামত আছে, আল্লাহর নাম করে খা। রোগ মুক্তির আশায় শীতল সেই পানি খেয়ে নিলাম। সকালে শুনি শুধু আমি না সারা দেশের মানুষ রোগ মুক্তির আশায় গভীর রাতে বাঁশ গাছ থেকে সেই শীতল পানি সংগ্রহ করে খেয়েছে। পরেরদিন ঠান্ডা জনিত কারণে ওই শীতল পানি খেযে আর কাউকে ডাক্তারের কাছে যেতে না হলেও আমাকে যেতে হয়েছিল। এখনো বাঁশ গাছ থেকে পানি বের হচ্ছে। আমারো এখনো গ্যাসের সমস্যায় ডাক্তারের দাওয়া খেতে হয় সকল সাজে।
বাজার করার সময় অধিকাংশ সময় এক কেজি করে পেঁয়াজ কেনা হয়। সেদিনও দোকানীকে এক কেজি পেঁয়াজ দিতে বলায় সে বলল, ভাই একটু বেশি করে নেন। ইন্ডিয়া পেঁয়াজ দেবে না , দাম বেড়ে যাবে। আমি বললাম, ১৫টাকার পেঁয়াজ এখন ৩৫ টাকায় কিনছি, আর কত বাড়বে? বেচারা দোকানদারের কথা না শুনে এক কেজি পেঁয়াজ কিনেই সেদিন সদাই সারি। ৫দিন পরে দোকানের সামনে হাজির হওয়ার সাথে সাথে দোকানী বলল, ভাই, আজ পেঁয়াজ ৭০ টাকা কেজি। আগের মতোই এক কেজি নিয়ে সরে পড়লাম। দুই দিন পরে পেঁয়াজ ঝাঁঝ ছাড়তে শুরু করেছে। তখন বাজার দর ১২০-১৫০ টাকা কেজি। তার একদিন পরে সকালে বাজারে গিয়ে দেখলাম, পেঁয়াজের ঝাঁজ ২০০ টাকা ছুঁয়েছে। খবরটি মনে হয় প্রশাসনের কাছে সবে পৌছেচে। তাই ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাকিম এসে কিছু খুচরা বিক্রেতাকে জরিমানা করেছেন। তবে, সুবিধা ছিল যতক্ষণ ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাকিম ছিল ,ততক্ষণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল কেজিতে ৫০ টাকা কমে  অর্থাৎ ১৫০ টাকায়। সচতুর ব্যবসায়ীরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাকিম চলে যাওয়ার সাথে সাথে এবার আর ৫০ টাকা না বাড়িয়ে ১০০টাকা বাড়িয়ে দেন। পরের দিন বাজারের পালায় আমাকে ২৫০ টাকায় কিনতে হলো এক কেজি পেঁয়াজরত্ন। মনে হলো পেঁয়াজ তো সব সময় রান্না ঘরে গৃহিনীর কাঁদায় এখন গৃহকর্তার কাঁদাচ্ছে।
ঋতুতে নবান্ন হলেও বাঙ্গালির শিকড় ও অস্তিত্বের সেই গ্রামে কৃষকের ঘরে নেই তার কোন নিদর্শন। যান্ত্রিক যুগ আর ফিবছর কৃষি পণ্যের দামের করুণ দশায় কৃষক আজ নুজ হয়ে যেন কাতরাচ্ছেন। এসব নিয়ে কথা হচ্ছিল বেশ কয়জন বসে। হঠাৎ লেন্টু ভাই ফোন আলাপের পর অনুজ রাসেলকে বলছে, শিগগিরি গিয়ে দুই কেজি করে লবন কিনে নিয়ে আয়। লবনের দাম বেড়ে গেছে। ঢাকায় লবন পাওয়া যাচ্ছে না। মুঠোফোনে সে একথাও বলেছে, ফেসবুক-টুক দেখছেন না! কোনকিছু বুঝে উঠার আগেই আমরা সবাই দোঁড়ালাম লবন কিনতে দোকানের দিকে। ততক্ষণে ফেসবুকের দৌরত্বে গাবা লেগে লবনও পেঁয়াজরত্ন হতে চলেছে। আমি একটি দোকানে গিয়ে লবন চাইতে দোকানী বলল, এদের আগে দিয়েনি। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার মতো অনেকে এসে হাজির হয়েছেন লবন কিনতে। তবে, মেঘ ভেদ করে সুর্য্যরে আলোর মতো একটি খবর এলো, এটা গুজোব। সাথে সাথে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিও নেমে পড়েছেন ভোক্তার পিট বাঁচাতে। মাইকের শব্দে ‘শোনা যাচ্ছে, “গুজোবে কান দিবেন না, বেশি দামে লবন বিক্রি করবেন না।” এ গুজোবের সুযোগ বেশি দূর না আগুলেও দোকানে আর লবন না থাকায় কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের অন্তত কিছুটা খাটনি কমেছে।
আমরা রক্ত দিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি তারপরও কী আমরা থাকব ‘হুজুকে বাঙ্গালি’ ? নিশ্চয় না। আসুন আমরা সবাই সজাগ হই।
এম আর মাসুদ
masudpress@gmail.com
ঝিকরগাছা, যশোর।