ঋষি পাড়ায় ঈদ আনন্দ: জীবন দৃষ্টিকোণ ll এম আর মাসুদ

ঋষি পাড়ায় ঈদ আনন্দ: জীবন দৃষ্টিকোণ

ll এম আর মাসুদ ll

ধর্ম চাই, সর্বাধিক সংখ্যক মানুষকে মানবতার চৌহদ্দিতে আনতে। মানুষ ধর্মকে কেন্দ্র করে তাই চাই বৈকি। স্বার্থপরতা, হীনতা, লোভ, আঁকড়ে থাকার বাসনা ইত্যাদি অধার্মিকতা থেকে একটা সংখ্যক মানুষ চেয়েছে ধর্মের বহুল বিস্তৃতি থামিয়ে দিতে। শিকড় দুর্বল করতে। আর সামষ্টিকতা যদি ধর্ম হয় তবে অধর্ম হচ্ছে, ভেদাভেদ- ব্যবধান। সুতরাং সমস্ত দিগন্তবিস্তৃত, প্রোথিত-গ্রোথিত ধর্মগুলা কালের এবং কালোর ছোবলে পড়ে সংকীর্ণতার নীলে আক্রান্ত। সকল বর্ণের ইসলাম, ভালোবাসার খৃস্টানিজম, আলোইহিমের (মানুষগণ) ইহুদি ধর্ম, ওঁম শান্তির সনাতন হিন্দু ধর্ম, সকল প্রাণী সুখী হোক-শান্তি লাভ করুক এর বৌদ্ধ ধর্ম সাথে সাথে মানব বিস্তৃতির তাঁও ধর্ম (চীন-জাপান)- ধীরে ধীরে এই ছোবলকে কেন্দ্র করে হয়ে যাচ্ছে একান্ত পারিবারিক। তারপরও গন্ডী বেঁধে দেওয়া, শিকল-পরা, আইল তুলে দেওয়া ধর্মকে ডিঙিয়ে প্রকৃত ধর্মের আহবানে নিজেকে, নিজেদেরকে বিলিয়ে দিতে পছন্দ করেন কেউ কেউ- কিছু মানুষ।
যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলাকে হিন্দু-মুসলিম মিলনকেন্দ্র বলা যেতে পারে। হিন্দুদের সার্বজনীন পূজাতে মুসলিমরা যেমন সার্বিক সহযোগিতা করেন ঠিক তেমন উদাহরণ হিসেবে উপজেলার বল্লা গ্রামে প্রতিবারের মতো এবারের কুরবানির ঈদে ঘটেছে গ্রহণ, অনুধাবন,অনুসরণ করার মতো ঘটনা। এ গ্রামের “বল্লা স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার” নামের সংগঠনের বিস্তৃত পদক্ষেপে গ্রামের ৭৩৪ মুসলিম পরিবারের সাথে ১৬টি হিন্দু পরিবার সেমাই-চিনি, মাংস আর মানসিক আনন্দের ভাগে ভাগাভাগি করে ঈদ উদযাপন করেছেন। এ পরিবারগুলা প্রায় সব হতদরিদ্র গত ১৮ বছর ধরে তারা প্রতিবার দরিদ্র মুসলিমদের মত কোরবানির মাংস পান। যা পেয়ে মুসলিম পরিবারের মতো রীতিমতো ঈদ আনন্দের কমতি থাকে না ঋষিপাড়ায়ও (মুচিপাড়া)। রেনুকা বালা দাস ওরফে ফড়িং। পেশায় ভিক্ষুক। প্রতিবছর ঈদে কোরবানির ছাগলের মাংস পান তিনি। দাম বেশি হওয়ায় তারপর সারা বছর ছাগলের মাংস আর কখনো কেনা হয়নি রেনুকা বালার। কোরবানির ছাগলের মাংস পেয়েছেন তিনি। একই পাড়ার গ্রাম পুলিশ নীলরতন কুমার দাস ওরফে রতন বাবু প্রতিবারের ন্যায় এবারও ছাগলের মাংস পেয়েছিলেন। নিজে কিনেছিলেন সেমাই চিনি। বাড়িতে এসেছিল মেয়ে জামাতা। রতন বাবুর মতো বাড়ি না; গোটা ঋষিপাড়ার দরিদ্র পরিবারগুলো ঈদের দিন উৎসবে মেতে উঠে কোরবানির মাংসকে ঘিরে। সাধন কুমার দাস দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকেন। কাজ করেন পোশাকশিল্পে। শুধু ঈদে বাড়ি আসেন। বিশেষ করে ঈদ-উল-আযহায় নিয়মিত বাড়ি আসেন। এবারও এসেছিলেন। ঈদের দিন সকালে সেমাই রান্না সহ ছিল বাড়তি আয়োজন। তারপর প্রাপ্ত কোরবানির মাংস রান্না হয়। সব মিলিয়ে সারাদিনই মুসলিম বাড়ির মত উৎসব ছিলো বলে দাবি করেন সাধন কুমার দাস। ব্যতিক্রম এই কাজটির সাথে দীর্ঘদিন জড়িত আসাদুজ্জামান আসাদ, আজহারুল ইসলাম মিথুন, হারুন-অর-রশিদ (মাস্টার), আব্দুস সালাম, শামীম, বিল্লাল ( মাইকেল), রকি সহ গ্রামের অর্ধশত ছেলে। কথা হয় তাদের সাথে। ঈদের দিন যথাসময়ে মাংস সংগ্রহ করে আনুপাতিক হারে প্যাকেজিং করে বিলিবণ্টন করে তারা। ২০০১ সালে শুরু হওয়া এই পদ্ধতিতে গ্রামের দরিদ্র মুসলিমদের মত হিন্দু পরিবারগুলো কুরবানির মাংস পেয়ে থাকেন। এ পদ্ধতির প্রবর্তক হিসেবে যাদের নাম শোনা যায় তাদের মধ্যে ডাক্তার মিজানুর রহমান (মির্জা), মাস্টার আব্দুর রাজ্জাক (মরহুম), আইনজীবী মাহবুবুল আলম, প্রভাষক শাহজুল কবির, ডাক্তার নাহিদুজ্জামান সাজ্জাদ অন্যতম। বল্লা গ্রামের এইসব গুণী সন্তানদের মতে, “কুরবানির মাংস প্রদান শুধু ধর্মীয় অনুশাসন নয়। এটা আমাদের সৌহার্দ্য, সম্প্রীতিও।
সূর্যকে আড়াল করে মেঘ। ধর্মকেও আড়াল করতে চাওয়া হয় সূর্যের মতো। ধর্ম মানবজমিনে ঠিক উঠে পড়ে, পড়বে। সূর্য আলোর মতো ধর্ম আলো ছড়িয়ে পড়ুক চৌদিকে। প্রকৃত ধর্ম।
লেখক – গণমাধ্যম কর্মী