আগুন লাগা রাইস্ট্যাগ ll গালীব বিন মোহাম্মদ

আগুন লাগা রাইস্ট্যাগ

ll গালীব বিন মোহাম্মদ ll

একখানা আগুন কতখানি প্রভাব বিস্তার করতে পারে ? ইতিহাসের মোড় কতটা ঘুরিয়ে দিতে পারে ? কত লোকের মৃত্যুর কিংবা ভোগান্তির কারণ হতে পারে ?
.
রাইস্ট্যাগ বিল্ডিং । জার্মানির পার্লামেন্ট ভবন । ইতিহাস পাল্টে দেয়া এক ভবন । কিংবা আরও নির্দিষ্ট করে বললে ইতিহাস পাল্টে দেয়া এই ভবনের আগুন । কিভাবে ? সেই গল্পই বলছি এবার ।
.
নভেম্বর ১৯৩২ । জার্মানির নির্বাচনে ‘নাৎসি পার্টি’ পপুলার ভোটে এগিয়ে গেলেও একক সংখ্যাগরিষ্টতা অর্জন করতে পারল না । হিটলার ‘চ্যান্সেলর’ হিসেবে কোয়ালিশন সরকারের নেতৃত্বে বসলেন । কিন্তু কোয়ালিশন সরকার নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার লোক তো হিটলার না । তার দরকার একক কর্তৃত্ব । তারউপর আবার জার্মানীর আইন অনুযায়ী প্রসিডেন্ট চাইলেই চ্যান্সেলরকে বরখাস্ত করতে পারতেন, যা হিটলারের জন্য খুবই বিপজ্জনক । তার সাথে সাথে হিটলারের দুই চোখের বিষ কম্যুনিস্টরা আবার ১৭% সিট দখল করে আছে । সুতরাং, তাঁদেরকে সরানোটাও জরুরী ।
.
হিটলারের তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক অসাধারণ এক চাল চাললো ! এমন একখানা চাল, যা একসাথে তিন তিনটি সমস্যারই সমাধান এনে দিল, সাথে একখানা বোনাস সুবিধা ! সেই চালটিই হলো রাইস্ট্যাগ বিল্ডিংয়ের আগুন !
.
১৯৩৩ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারী রাত । বার্লিনের ফায়ার ডিপার্টমেন্ট খবর পেল রাইস্ট্যাগ বিল্ডিংয়ে আগুন লেগেছে । ফায়ায় ফাইটারদের আপ্রান চেষ্টার পর রাত সাড়ে এগারোটার দিকে যখন আগুন কমল, ততক্ষণে পুরো বিল্ডিংটাই পুড়ে প্রায় ধ্বংশ হয়ে গেছে ! খবর পেয়ে হিটলার স্বয়ং উপস্থিত হলেন ঘটনাস্থলে – সাথে তাঁর দুই-রত্ন: যোসেফ গোয়েবেলস আর হারমান গোরিং । সাথে সাথে স্ক্রীপ্ট অনুযায়ী বইতে শুরু হলো ঘটনা । চালু হয়ে গেল নাৎসিদের নিখুঁত এবং সুদক্ষ প্রোপাগান্ডা মেশিন !
.
ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়েই তক্ষুণি বলা হলো “এই ঘটনা কম্যুনিস্টদের দ্বারা ঘটানো । একজন কম্যুনিস্টকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে !” হিটলার ঘোষনা দিল “জার্মানিতে কম্যুনিস্ট বিপ্লব শুরুর সংকেত এটি ।” সে এই অগ্নিকান্ডকে বর্ণনা করলো জার্মানবাসীর জন্য আসন্ন কম্যুনিস্ট বিপ্লবের ব্যাপারে ‘ঈশ্বরের সাবধান-সংকেত’ হিসেবে । পরদিন খবরের কাগজে ছাপা হলো “এই জঘন্য ঘটনা জার্মানীর বলশেভিক (কম্যুনিস্ট) দ্বারা ঘটানো” কিংবা “জাতি এবং রাষ্ট্র হিসেবে পুরো জার্মানী আজ এক ভয়াবহ হুমকির সম্মুখিন ” এর মত সব হেডলাইন । সাধারণ নাগরিকদের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে আর কি লাগে !
.
পরবর্তিতে ঘটনা ঘটল খুব দ্রুত এবং হিটলারের এই এক চালেই একে একে মারা পরল তিনটি পাখি ।
প্রথমত: জার্মান প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ দেশে ইমার্জেন্সী জারি করলেন । রদ করলেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, খবর প্রকাশের স্বাধীনতা, মিটিং-মিছিল-সংগঠন করবার স্বাধীনতা, চিঠিপত্র আর টেলিফোনে যোগাযোগের গোপনীয়তার মত সকল মৌলিক অধিকার ।
দ্বিতীয়ত: গ্রেপ্তার করা হলো কম্যুনিস্ট পার্টির সকল হর্তা কর্তা সহ অসংখ্য নেতা-কর্মিদের । সুতরাং, ৫ সপ্তাহ পরের পূর্ননির্বাচনে নাৎসী’রা পেয়ে গেল একক সংখ্যাগরিষ্টতা – পার্লামেন্টের ৫২% সীট । সাথে সাথে তাঁরা পার্লামেন্টে পাশ করল Enabling Act, যা হিটলারকে দিল আইনসভাকে পাশ কাটিয়ে যেকোন আইন কিংবা আদেশ দেবার একক সর্বময় ক্ষমতা । ঠিক যা হিটলার চাইছিল ।
তৃতীয়ত: এর মাধ্যমে চ্যান্সেলরকে বরখাস্ত করার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাও রহিত করা হলো । সুতরাং, হিটলারের একক কতৃত্বের সামনে আর কোন কাঁটা রইল না ।
চতুর্থত এবং বোনাস হিসেবে হিটলার পেলেন আমেরিকা এবং পশ্চিম ইউরোপের নিরব সমর্থন, কারণ তারা হিটলারের নাৎসি পার্টিকে দেখেছিলেন কম্যুনিস্টদের প্রতিহত করার শক্তি হিসেবে!
.
পরের ঘটনা সবারই জানা ।
প্রায় ৯ কোটি মানুষের মৃত্যু আর প্রায় পুরো একটা মহাদেশ ধ্বংশস্তুপে পরিণত হবার যুদ্ধের রাজনৈতিক চালটা শুরু হয়েছিল এই রাইস্ট্যাগ বিল্ডিংয়ের আগুন থেকেই । আর কোনও কালে মাত্র একখানা বিল্ডিংয়ের আগুন পৃথিবীর ইতিহাসে এতবড় প্রভাব ফেলেছিল বলে জানা যায় না ।
.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরও রাইস্ট্যাগ পরে থাকে অযত্ন আর অবহেলায় । অবশেষে পূর্ব আর পশ্চিম জার্মানী এক হবার পর ১৯৯২ সালে শুরু হয় এর পূর্ননির্মানের কাজ । দীর্ঘ ৭ বছর পর ১৯৯৯ সালে উন্মুক্ত হয় নতুন রাইস্ট্যাগ বিল্ডিং । পুরানো ঐতিহ্য আর আধুনিকত্ব মিলিয়ে এক অসাধারণ স্থাপত্যকলা ! শ্রদ্ধা-জাগানিয়া, বিশাল কিন্তু নাৎসি স্থাপত্যগুলোট মত বুকে কাঁপন ধরায় না ।
.
এবার বার্লিনে বেড়াতে গিয়ে রাইস্ট্যাগ বিল্ডিংখানা লিস্টের একদম উপরের দিকে ছিল । মেট্রো ধরে যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছালাম তখন বিকেল বলা যায় । গ্রীষ্মের চকচকে পরিষ্কার রোদে পুরো বিল্ডিংখানা যেন গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । বিল্ডিংয়ের সামনে বড় বড় করে লেখা ‘DEM DEUTSCHEN VOLKE’ অর্থাৎ ‘জার্মান জনগণের জন্য’ ।
প্রায় কয়েকশ ট্যুরিস্ট ঘোরাফেরা করছে আসপাশ দিয়ে । চাইলে ভবনের ভেতরেও ঘুরে আসা যায় কিন্তু টিকেট কাটতে হয় অন্ত:ত এক সপ্তাহ আগে । আমার সেটি জানা ছিল না বলে ভেতরে যাওয়া হলো না । দুর্ভাগ্য ! সামনে বিশালাকারের দুটো পতাকা পতপত করে উড়ছে – একখানা জার্মানীর, আরেকখানা ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের । গুটিগুটি পায়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালাম এই প্রায় সোয়াশ’ বছরের সাক্ষাৎ পাথুরে ইতিহাসের সামনে ! সেই জার্মান সাম্রাজ্যের কাল থেকে শুরু । তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নির্মম পরাজয়, নাৎসিদের ভয়াবহ উত্থান এবং নির্মম পতন, ঠান্ডাযুদ্ধের নার্ভ-কাঁপানো উত্তেজনা আর সাথে দুই-জার্মানীর লক্ষ-কোটি মানুষের হাহাকার, সেখান থেকে আবার জার্মানীর পূনর্মিলন এবং আবারও বিশ্বের অন্যতম রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্নপ্রকাশ, এক ইউরোপের জন্ম… … …এরকম কত পৃথিবী পাল্টে দেয়া ঘটনার নীরব সাক্ষী এই রাইস্ট্যাগ বিল্ডিংখানা ! ভাবতেও গা শিউরে ওঠে !
.
আধুনিক রাইস্ট্যাগ বিল্ডিং অন্যতম বড় আকর্ষণ এর ঠিক মাঝখানের একখানা কাঁচের ডোম বা গম্বুজ । ভাবছেন সামান্য একখানা গম্বুজের আবার কি এত আকর্ষন ? এর কারণ হচ্ছে এই গম্বুজখানা ঠিক পার্লামেন্টের এ্যসেম্বলী হলরুমের উপরে তৈরী, যেখানে বসে সংসদ সদস্যগণ তর্ক-বিতর্ক, আইন প্রণোয়ন-বাতিল ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ন কাজগুলো করেন । স্বচ্ছ কাঁচের গম্বুজের ভেতরে বসে সাধারণ জার্মান নাগরিকগণ দেখতে পারেন সংসদে তাঁদের পাঠানো প্রতিনিধিরা ঠিক কি কাজ করছেন, কি আইন বানাচ্ছেন বা কোন আইন বাতিল করছেন । ডোমখানা প্রতিকীস্বরুপ হলেও জার্মানদের কাছে রাজনৈতিক নেতাদের উপর এই চোখ রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । কারণ তাঁরা একবার নেতাদের বিশ্বাস করেছিল, যার বিনিময়ে শুধু পুরো জার্মানী না প্রায় পুরো মহাদেশটাই পৌঁছে গিয়েছিল ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তাঁদের ভাষায় “চাকরদের উপর সবসময় চোখ রাখ, নইলে তারা যে শুধু কাজে ফাঁকি দিবে তাই না, পারলে তোমার বাড়িটাই দখল করে নিবে ।”
.
জমিদার হয়ে যাওয়া আমাদের শত শত ভিআইপিদের সাথে জার্মানীর রাজনৈতিক পার্থক্যটা এখানেই।
লেখকঃ ভ্রমণ সাহিত্যিক ও ইতিহাস অনুসন্ধানী

 


বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।